![]() |
| সেই কারখানার রাস্তা কেটে দিল সিটি করপোরেশন |
রাজধানীর উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় অবস্থিত নেপচুন অ্যাকসেসরিজ সলিউশন কারখানায় প্রবেশের একমাত্র সড়ক খনন করে কেটে দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। সোমবার (৩ আগস্ট) দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, কারখানার সামনের রাস্তার একটি অংশ খনন করে মাটি পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। ফলে কারখানায় যাতায়াত কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
এই ঘটনা ঘটেছে এমন এক সময়, যখন আগের দিন একই কারখানাকে কেন্দ্র করে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান ও স্থানীয় সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন-এর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার পর থেকেই কারখানাটি বন্ধ রয়েছে।
ডিএনসিসির ব্যাখ্যা
ডিএনসিসির অঞ্চল-৮-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা আ ন ম বদরুদ্দোজা জানান, ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পানি নিষ্কাশনের জন্য একটি নালা নির্মাণের প্রয়োজন ছিল। তবে কারখানা কর্তৃপক্ষের আপত্তির কারণে কাজটি শুরু করা সম্ভব হয়নি।
তার ভাষ্য, সাম্প্রতিক ঘটনার পর কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ায় রাস্তা কেটে নালা নির্মাণ শুরু করা হয়েছে। তিনি বলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে রাস্তা পুনর্নির্মাণ করা হবে।
কারখানার অভিযোগ
কারখানার ভেতরে দায়িত্বশীল কাউকে না পাওয়া গেলেও কয়েকজন কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, কারখানার মালিকপক্ষকে চাপে ফেলতেই ইচ্ছাকৃতভাবে রাস্তা কেটে দেওয়া হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, এটি কোনো নিয়মিত উন্নয়নকাজ নয়; বরং সাম্প্রতিক বিরোধের জেরেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ময়লা ফেলা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ
নেপচুন অ্যাকসেসরিজ সলিউশনের সামনেই রয়েছে ডিএনসিসির একটি অস্থায়ী বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র (এসটিএস), যা ২০২৩ সালে নির্মাণ করা হয়।
কারখানার কর্মীদের দাবি, এসটিএসে জমে থাকা ময়লার দুর্গন্ধের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল এবং বিদেশি ক্রেতারাও আপত্তি জানিয়েছিলেন। পরে বিষয়টি আদালতে গেলে কারখানা কর্তৃপক্ষ ওই স্থানে বর্জ্য রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা পান।
কর্মীদের অভিযোগ, আদালতের আদেশের পর এসটিএসের ভেতরে বর্জ্য না রেখে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা কারখানার সামনের সড়কেই ময়লা ফেলতে শুরু করেন, যাতে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি কারখানায় প্রবেশও বাধাগ্রস্ত হয়।
এখনও রাস্তাতেই ময়লার স্তূপ
সোমবার দুপুরেও দেখা যায়, কারখানার সামনের সড়কে ময়লার স্তূপ করা হয়েছে। কয়েকটি পিকআপ ও ইঞ্জিনচালিত যান থেকে ধারাবাহিকভাবে বর্জ্য ফেলা হচ্ছিল, যার ফলে প্রবেশপথ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
এ বিষয়ে এসটিএসের কর্মী হাসমত আলী বলেন, আদালতের নির্দেশের কারণে কেন্দ্রের ভেতরে বর্জ্য রাখা যাচ্ছে না। তাই আপাতত সরকারি সড়কের অংশে ময়লা রাখা হচ্ছে এবং পরে রাতে সেগুলো আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে নিয়ে যাওয়া হয়।
যেভাবে শুরু হয় সংঘর্ষ
রোববার সকালে কারখানার সামনে ময়লা ফেলার দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করতে গেলে কারখানার এক ব্যবস্থাপককে বাধা দেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়, যা পরে ধাক্কাধাক্কি, হাতাহাতি ও ইটপাটকেল নিক্ষেপে রূপ নেয়।
বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান এবং ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন। সেখানে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
কারখানার শ্রমিকদের দাবি, মালিককে হেনস্তা করা হচ্ছিল। এ সময় শ্রমিকরা বেরিয়ে এসে তাকে রক্ষা করেন।
অন্যদিকে ডিএনসিসির দাবি, প্রশাসক ও সংসদ সদস্যের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে। সংস্থাটির অভিযোগ, মালিকপক্ষের ভাড়াটে লোকজন অতর্কিতভাবে হামলা চালায়।
মামলা ও গ্রেপ্তার
উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, এ ঘটনায় ডিএনসিসি বাদী হয়ে মামলা করেছে। এখন পর্যন্ত ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মধ্যরাতে রাস্তা খনন
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশাসক ও সংসদ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই, রাত সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে, ডিএনসিসির একটি এক্সক্যাভেটর দিয়ে কারখানার সামনের রাস্তা কেটে ফেলা হয়।
বিশেষজ্ঞের মতামত
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকায় অনেক এসটিএস পরিকল্পনা অনুযায়ী স্থাপন করা হয়নি। ফলে আবাসিক ও শিল্প এলাকার কাছাকাছি বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র গড়ে ওঠায় স্থানীয়দের ভোগান্তি ও বিরোধ বাড়ছে।
তার মতে, ভবিষ্যতে রাজউকের মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজন হলে জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে উপযুক্ত স্থানে এসটিএস নির্মাণ করা উচিত, যাতে জনদুর্ভোগ ও এ ধরনের সংঘাত এড়ানো যায়।

No comments:
Post a Comment